০৭:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ওষুধের অভাবে মৃত্যুর মুখে গাজার রোগীরা, অবরোধ অব্যাহত ইসরাইলের

  • অনলাইন ডেক্স
  • আপলোড সময় : ০৪:৩১:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৬৮ Time View

ইসরাইলের অব্যাহত অবরোধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধার কারণে ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডের স্বাস্থ্যব্যবস্থা চরম সংকটে পড়েছে। ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তার অভাবে হাজারও রোগী মৃত্যুর মুখে, আর হাসপাতালগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন গাজার শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ইসরাইলের অব্যাহত অবরোধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধার কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এতে হাজারও রোগী মৃত্যুঝুঁকি বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের আশঙ্কায় রয়েছেন বলে সতর্ক করেছেন গাজার এক শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ মঙ্গলবার আল জাজিরাকে বলেন, গাজার হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি এখন ‘করুণ ও ভয়াবহ’। ইসরাইল প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর প্রবেশ অব্যাহতভাবে আটকে রাখায় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারছেন না চিকিৎসকেরা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় জীবনরক্ষাকারী মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ঢুকতে না দেয়ায় তাদের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসকেরা জানিয়ে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল  হামাসের সঙ্গে করা সমঝোতা লঙ্ঘন করে নির্ধারিত সংখ্যক চিকিৎসা সহায়তা বহনকারী ট্রাক ঢুকতে দিচ্ছে না। এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী চলমান ও সংকটাপন্ন স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা আরও গভীর হচ্ছে।

আল-বারশ জানান, ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর ব্যাপক ঘাটতিতে ভুগছে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব প্রকট। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই পাওয়া যাচ্ছে না। স্যালাইন, অবশ করার ওষুধ, গজ, ডায়ালাইসিস সামগ্রীর তীব্র সংকট রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের ভয়াবহ ঘাটতিও চিকিৎসা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠনের পর গত ৩০ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট।

মূলত ইসরাইলের দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই আগ্রাসনে গাজার প্রায় সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হামলার শিকার হয়েছে। অন্তত ১২৫টি স্বাস্থ্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৪টি হাসপাতাল। এ সময় ইসরাইলি হামলায়  ১ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। এখনও ৯৫ জন ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে আটক করে রেখেছে দখলদার বাহিনী, যাদের মধ্যে ৮০ জনই গাজার।

আল-বারশ বলেন, শুধু ইসরাইলি হামলায় আহতরাই নয়, এই সংকটে ভুগছেন আরও বহু রোগী। চিকিৎসার অভাবে প্রায় ৪ হাজার গ্লকোমা রোগী স্থায়ী অন্ধত্বের ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার বাস্তুচ্যুত অন্তঃসত্ত্বা নারী অস্বাস্থ্যকর আশ্রয়ে বসবাস করছেন। আর এটি তাদের ও অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

এদিকে ইসরাইলি সহায়তা সীমাবদ্ধতার কারণে মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। গাজার বাইরে চিকিৎসার জন্য রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে অপেক্ষার তালিকা দীর্ঘ, আর সেই অপেক্ষাতেই প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে।

আল-বারশ জানান, চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় অন্তত ১ হাজার ১৫৬ রোগী মারা গেছেন। এই প্রক্রিয়াটি ‘দীর্ঘ ও জটিল’। গাজার চিকিৎসকদের রেফার করা রোগীদের তালিকা প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পর্যালোচনা করে, এরপর নিরাপত্তা অনুমোদনের জন্য তা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, গাজায় প্রায় ২০ হাজার রোগী বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে ডব্লিউএইচও ১৮ হাজার ৫০০ জনকে অনুমোদন দিয়েছে, আর প্রায় ৩ হাজার ৭০০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

অপেক্ষমাণ রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন শিশু রয়েছে। আল-বারশ অবিলম্বে সীমান্ত ক্রসিং খুলে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেয়া এবং গুরুতর রোগীদের বাইরে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, আরও দেরি হলে বহু প্রাণ ঝরে যেতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ওষুধের অভাবে মৃত্যুর মুখে গাজার রোগীরা, অবরোধ অব্যাহত ইসরাইলের

আপলোড সময় : ০৪:৩১:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

ইসরাইলের অব্যাহত অবরোধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধার কারণে ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডের স্বাস্থ্যব্যবস্থা চরম সংকটে পড়েছে। ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তার অভাবে হাজারও রোগী মৃত্যুর মুখে, আর হাসপাতালগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন গাজার শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ইসরাইলের অব্যাহত অবরোধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধার কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এতে হাজারও রোগী মৃত্যুঝুঁকি বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের আশঙ্কায় রয়েছেন বলে সতর্ক করেছেন গাজার এক শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ মঙ্গলবার আল জাজিরাকে বলেন, গাজার হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি এখন ‘করুণ ও ভয়াবহ’। ইসরাইল প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর প্রবেশ অব্যাহতভাবে আটকে রাখায় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারছেন না চিকিৎসকেরা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় জীবনরক্ষাকারী মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ঢুকতে না দেয়ায় তাদের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসকেরা জানিয়ে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল  হামাসের সঙ্গে করা সমঝোতা লঙ্ঘন করে নির্ধারিত সংখ্যক চিকিৎসা সহায়তা বহনকারী ট্রাক ঢুকতে দিচ্ছে না। এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী চলমান ও সংকটাপন্ন স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা আরও গভীর হচ্ছে।

আল-বারশ জানান, ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর ব্যাপক ঘাটতিতে ভুগছে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব প্রকট। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই পাওয়া যাচ্ছে না। স্যালাইন, অবশ করার ওষুধ, গজ, ডায়ালাইসিস সামগ্রীর তীব্র সংকট রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের ভয়াবহ ঘাটতিও চিকিৎসা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠনের পর গত ৩০ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট।

মূলত ইসরাইলের দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই আগ্রাসনে গাজার প্রায় সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হামলার শিকার হয়েছে। অন্তত ১২৫টি স্বাস্থ্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৪টি হাসপাতাল। এ সময় ইসরাইলি হামলায়  ১ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। এখনও ৯৫ জন ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে আটক করে রেখেছে দখলদার বাহিনী, যাদের মধ্যে ৮০ জনই গাজার।

আল-বারশ বলেন, শুধু ইসরাইলি হামলায় আহতরাই নয়, এই সংকটে ভুগছেন আরও বহু রোগী। চিকিৎসার অভাবে প্রায় ৪ হাজার গ্লকোমা রোগী স্থায়ী অন্ধত্বের ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার বাস্তুচ্যুত অন্তঃসত্ত্বা নারী অস্বাস্থ্যকর আশ্রয়ে বসবাস করছেন। আর এটি তাদের ও অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

এদিকে ইসরাইলি সহায়তা সীমাবদ্ধতার কারণে মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। গাজার বাইরে চিকিৎসার জন্য রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে অপেক্ষার তালিকা দীর্ঘ, আর সেই অপেক্ষাতেই প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে।

আল-বারশ জানান, চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় অন্তত ১ হাজার ১৫৬ রোগী মারা গেছেন। এই প্রক্রিয়াটি ‘দীর্ঘ ও জটিল’। গাজার চিকিৎসকদের রেফার করা রোগীদের তালিকা প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পর্যালোচনা করে, এরপর নিরাপত্তা অনুমোদনের জন্য তা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, গাজায় প্রায় ২০ হাজার রোগী বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে ডব্লিউএইচও ১৮ হাজার ৫০০ জনকে অনুমোদন দিয়েছে, আর প্রায় ৩ হাজার ৭০০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

অপেক্ষমাণ রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন শিশু রয়েছে। আল-বারশ অবিলম্বে সীমান্ত ক্রসিং খুলে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেয়া এবং গুরুতর রোগীদের বাইরে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, আরও দেরি হলে বহু প্রাণ ঝরে যেতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন