১২:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সমাজসেবা ইবাদতের এক নীরব ভাষা

  • সকাল সংবাদ
  • আপলোড সময় : ০৭:৫৩:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩০৭ Time View

মানুষের জীবনে এমন কিছু কাজ আছে, যা খুব উচ্চস্বরে নিজের মহত্ত্ব ঘোষণা করে না। তার কোনো মিম্বর নেই, নেই তাসবিহের শব্দ, নেই দীর্ঘ কিয়ামের দৃশ্যমানতা। তবু সেসব কাজ আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায় গভীর সন্তুষ্টির ভাষায়। আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায় এক অব্যর্থ আবেদন নিয়ে।

সমাজসেবা ঠিক তেমনই এক নীরব ইবাদত—যার শব্দ নেই, কিন্তু এর প্রতিধ্বনি আখিরাত পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

ক্ষুধার্ত শিশুটির মুখে এক মুঠো খাবার তুলে দেওয়া, অসহায় বৃদ্ধের হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়া, নিঃস্ব মানুষটির কাঁধে নির্ভরতার স্পর্শ রেখে বলা; “তুমি একা নও” এসব কাজকে আমরা অনেক সময় মানবিকতা বলেই সীমাবদ্ধ করি। অথচ ইসলাম এসবকে তার চেয়েও অনেক উঁচু মর্যাদা দিয়েছে। ইসলাম সমাজসেবাকে দেখেছে ঈমানের বাস্তব প্রকাশ হিসেবে, ইবাদতের জীবন্ত রূপ হিসেবে।

পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ‘ধার্মিকতা’ বা বির্‌র–এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন:  ‘ধার্মিকতা এই নয় যে, তোমরা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ ফেরাও; বরং ধার্মিক সে-ই, যে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় সম্পদ দান করে আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির, প্রার্থনাকারী ও দাস মুক্তির জন্য…” (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

এই আয়াত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইবাদত কেবল জায়নামাজে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রয়োজনে সম্পদ, সময় ও হৃদয় উজাড় করে দেওয়াও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, বরং ঈমানের প্রমাণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর জীবন ছিল সমাজসেবার এক অনুপম পাঠশালা। তিনি এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে অবহেলা নয় বরং; দুর্বলতা ছিল অধিকার পাওয়ার কারণ।

তিনি ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন, বিধবার পাশে দাঁড়িয়েছেন, দাসের সঙ্গে একই কাতারে বসে খেয়েছেন। নিজ হাতে কাজ করেছেন, অসুস্থের সেবা করেছেন, প্রতিবেশীর খোঁজ নিয়েছেন। তিনি বলেছেন:  ‘আমি ও ইয়াতীমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে একসাথে থাকব—এই বলে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি করে দেখালেন।’(বুখারি, হাদিস: ৫৩০৪)

 

এই হাদিস সমাজসেবার মর্যাদাকে জান্নাতের সান্নিধ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। এখানেই ইসলামের অনন্যতা।

ইসলাম সমাজসেবাকে দয়া হিসেবে নয়; বরং মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। ইসলাম সমাজসেবাকে ঈমানের পরিমাপক হিসেবেও সামনে এনেছে। রাসুল (সা.) কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন:  ‘সে মুমিন নয়, যে নিজে তৃপ্ত থাকে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৪৭)

 

এটি কোনো উপদেশমূলক কথামাত্র নয়; এটি ঈমানের মানদণ্ড। অর্থাৎ সমাজের প্রতি দায়িত্বহীনতা ঈমানের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। নামাজ, রোজা, হজ সবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মানুষের হক উপেক্ষা করলে সেই ইবাদত আল্লাহর দরবারে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইসলাম সমাজসেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপও দিয়েছে। জাকাতের মতো ফরজ ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্বে পরিণত করেছে। ওয়াক্‌ফ প্রথার মাধ্যমে শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনকল্যাণকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইসলামী সভ্যতার বহু যুগে এমন সময় এসেছে, যখন জাকাত গ্রহণ করার মতো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল (ইমাম ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া–তে উমর ইবন আবদুল আজিজ (রহ.)–এর শাসনামলের বিবরণ দ্রষ্টব্য)।

আজকের সমাজে আমরা উন্নয়ন, অগ্রগতি ও আধুনিকতার কথা বলি। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি মানুষের চোখের পানি মুছাতে না পারে, ক্ষুধার্তের আহার জোগাতে না পারে, অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে না পারে; তবে তা কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন, মানবতার নয়। জাতীয় সমাজসেবা দিবস আমাদের সেই কথাটিই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজসেবা কোনো ঐচ্ছিক বিলাসিতা নয়; এটি সভ্যতার মেরুদণ্ড।

সবচেয়ে গভীর সত্য হলো; সমাজসেবার সবচেয়ে সুন্দর দিক তার নীরবতা। এটি লোকদেখানো নয়, প্রচারনির্ভর নয়। ডান হাত যা দেয়, বাম হাত তা জানেও না; এই নীরবতাই একে ইবাদতের ভাষা করে তোলে। রাসুল (সা.) বলেছেন:  ‘সাত শ্রেণির মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকবে… তাদের একজন হলো সে ব্যক্তি, যে এমনভাবে সদকা করে যে তার বাম হাত জানে না, ডান হাত কী দান করেছে।” (বুখারি, হাদিস: ৬৬০; মুসলিম, হাদিস: ১০৩১)

জাতীয় সমাজসেবা দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা কি সমাজসেবাকে কেবল দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ করে নিয়েছি, নাকি একে জীবনের নৈতিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছি? আমরা কি মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি সামাজিক স্বীকৃতির আশায়?

সমাজসেবা তখনই ইবাদতে রূপ নেয়, যখন তা হয় নিঃস্বার্থ, নীরব এবং নিয়তনির্ভর। তখন তা কেবল একজন মানুষের জীবন বদলায় না; বরং সমাজের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে। আর সেই জাগরণই ইসলামের কাঙ্ক্ষিত সমাজ; যেখানে মানুষ মানুষের জন্য দাঁড়ায়, আর আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তাঁর বান্দাদের দেখে।

আল্লাহ আমাদের সকলকে নববী আদর্শের সমাজ বিনির্মাণের চেষ্ঠায় যুক্ত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

সমাজসেবা ইবাদতের এক নীরব ভাষা

আপলোড সময় : ০৭:৫৩:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

মানুষের জীবনে এমন কিছু কাজ আছে, যা খুব উচ্চস্বরে নিজের মহত্ত্ব ঘোষণা করে না। তার কোনো মিম্বর নেই, নেই তাসবিহের শব্দ, নেই দীর্ঘ কিয়ামের দৃশ্যমানতা। তবু সেসব কাজ আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায় গভীর সন্তুষ্টির ভাষায়। আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায় এক অব্যর্থ আবেদন নিয়ে।

সমাজসেবা ঠিক তেমনই এক নীরব ইবাদত—যার শব্দ নেই, কিন্তু এর প্রতিধ্বনি আখিরাত পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

ক্ষুধার্ত শিশুটির মুখে এক মুঠো খাবার তুলে দেওয়া, অসহায় বৃদ্ধের হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়া, নিঃস্ব মানুষটির কাঁধে নির্ভরতার স্পর্শ রেখে বলা; “তুমি একা নও” এসব কাজকে আমরা অনেক সময় মানবিকতা বলেই সীমাবদ্ধ করি। অথচ ইসলাম এসবকে তার চেয়েও অনেক উঁচু মর্যাদা দিয়েছে। ইসলাম সমাজসেবাকে দেখেছে ঈমানের বাস্তব প্রকাশ হিসেবে, ইবাদতের জীবন্ত রূপ হিসেবে।

পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ‘ধার্মিকতা’ বা বির্‌র–এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন:  ‘ধার্মিকতা এই নয় যে, তোমরা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ ফেরাও; বরং ধার্মিক সে-ই, যে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় সম্পদ দান করে আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির, প্রার্থনাকারী ও দাস মুক্তির জন্য…” (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

এই আয়াত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইবাদত কেবল জায়নামাজে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রয়োজনে সম্পদ, সময় ও হৃদয় উজাড় করে দেওয়াও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, বরং ঈমানের প্রমাণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর জীবন ছিল সমাজসেবার এক অনুপম পাঠশালা। তিনি এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে অবহেলা নয় বরং; দুর্বলতা ছিল অধিকার পাওয়ার কারণ।

তিনি ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন, বিধবার পাশে দাঁড়িয়েছেন, দাসের সঙ্গে একই কাতারে বসে খেয়েছেন। নিজ হাতে কাজ করেছেন, অসুস্থের সেবা করেছেন, প্রতিবেশীর খোঁজ নিয়েছেন। তিনি বলেছেন:  ‘আমি ও ইয়াতীমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে একসাথে থাকব—এই বলে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি করে দেখালেন।’(বুখারি, হাদিস: ৫৩০৪)

 

এই হাদিস সমাজসেবার মর্যাদাকে জান্নাতের সান্নিধ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। এখানেই ইসলামের অনন্যতা।

ইসলাম সমাজসেবাকে দয়া হিসেবে নয়; বরং মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। ইসলাম সমাজসেবাকে ঈমানের পরিমাপক হিসেবেও সামনে এনেছে। রাসুল (সা.) কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন:  ‘সে মুমিন নয়, যে নিজে তৃপ্ত থাকে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৪৭)

 

এটি কোনো উপদেশমূলক কথামাত্র নয়; এটি ঈমানের মানদণ্ড। অর্থাৎ সমাজের প্রতি দায়িত্বহীনতা ঈমানের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। নামাজ, রোজা, হজ সবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মানুষের হক উপেক্ষা করলে সেই ইবাদত আল্লাহর দরবারে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইসলাম সমাজসেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপও দিয়েছে। জাকাতের মতো ফরজ ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্বে পরিণত করেছে। ওয়াক্‌ফ প্রথার মাধ্যমে শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনকল্যাণকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইসলামী সভ্যতার বহু যুগে এমন সময় এসেছে, যখন জাকাত গ্রহণ করার মতো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল (ইমাম ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া–তে উমর ইবন আবদুল আজিজ (রহ.)–এর শাসনামলের বিবরণ দ্রষ্টব্য)।

আজকের সমাজে আমরা উন্নয়ন, অগ্রগতি ও আধুনিকতার কথা বলি। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি মানুষের চোখের পানি মুছাতে না পারে, ক্ষুধার্তের আহার জোগাতে না পারে, অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে না পারে; তবে তা কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন, মানবতার নয়। জাতীয় সমাজসেবা দিবস আমাদের সেই কথাটিই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজসেবা কোনো ঐচ্ছিক বিলাসিতা নয়; এটি সভ্যতার মেরুদণ্ড।

সবচেয়ে গভীর সত্য হলো; সমাজসেবার সবচেয়ে সুন্দর দিক তার নীরবতা। এটি লোকদেখানো নয়, প্রচারনির্ভর নয়। ডান হাত যা দেয়, বাম হাত তা জানেও না; এই নীরবতাই একে ইবাদতের ভাষা করে তোলে। রাসুল (সা.) বলেছেন:  ‘সাত শ্রেণির মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকবে… তাদের একজন হলো সে ব্যক্তি, যে এমনভাবে সদকা করে যে তার বাম হাত জানে না, ডান হাত কী দান করেছে।” (বুখারি, হাদিস: ৬৬০; মুসলিম, হাদিস: ১০৩১)

জাতীয় সমাজসেবা দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা কি সমাজসেবাকে কেবল দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ করে নিয়েছি, নাকি একে জীবনের নৈতিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছি? আমরা কি মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি সামাজিক স্বীকৃতির আশায়?

সমাজসেবা তখনই ইবাদতে রূপ নেয়, যখন তা হয় নিঃস্বার্থ, নীরব এবং নিয়তনির্ভর। তখন তা কেবল একজন মানুষের জীবন বদলায় না; বরং সমাজের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে। আর সেই জাগরণই ইসলামের কাঙ্ক্ষিত সমাজ; যেখানে মানুষ মানুষের জন্য দাঁড়ায়, আর আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তাঁর বান্দাদের দেখে।

আল্লাহ আমাদের সকলকে নববী আদর্শের সমাজ বিনির্মাণের চেষ্ঠায় যুক্ত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন